বড়পীর, মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী (র.) : জ্ঞান, দুনিয়াবিমুখতা ও তাসাউফের  অবিসংবাদিত ইমাম

আমিন হাবাল্লা

বড়পীর আবদুল কাদির জিলানী (র.) বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের শ্রদ্ধার পাত্র। প্রাচ্যের মুসলমানদের নিকট তিনি “ধূসর বাজপাখি” (البازي الأشهب) হিসেবে অভিহিত। তিনি ইসলামের ইতিহাসকে আলোকিত করেছেন। শিক্ষার জ্ঞানকে হৃদয়ের আবেগ ও মসজিদের মিহরাব থেকে জীবনের সক্রিয়তা, ইতিহাসের সুগম পথ, দিনের পাথেয়, বাজারের কোলাহল এবং মুসলিম বিজেতাদের ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনিতে নিয়ে এসেছেন।

আবদুল কাদির জিলানী (র.) তাঁর উপাধি পেয়েছেন তাবারিস্তানের মাটি থেকে যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রামের নাম জিলানের সাথে তাঁকে সম্বন্ধিত করা হয়। তাঁর জীবনীর ঐতিহাসিকদের মতে তিনি একজন সম্ভ্রান্ত হাসানী। তাঁর বংশপরম্পরা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। বলা হয় যে, যখন আহলে বায়তের সদস্যগণ পৃথিবীর নানা প্রান্তে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তখন তাঁর পূর্বপুরুষেরা মুসলিম বিশ্বের পূর্ব প্রান্তে আবাস গড়েছিলেন। যেন তাঁরা তারকাদের মতো পৃথিবীর আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা সবসময় সেই শাসনব্যবস্থার অত্যাচারের শিকার ছিলেন, যারা তাঁদের ধর্মীয় আকর্ষণকে স্থায়ী কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখত।

আবদুল কাদের জিলানী (র.) ৪৭১ হিজরির আশেপাশে জিলান গ্রামে একটি সম্মানিত ও প্রাচীন জ্ঞানসমৃদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ, দুনিয়াবিমুখ দরবেশ, যিনি দুনিয়ার প্রতি মনোযোগ দেননি। তাঁর মাতা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য ছিলেন। সেই পরিবার নবীর আদর্শ অনুসরণের বরকত দ্বারা সুশোভিত ছিল।

জিলানী তাঁর চোখ খুলেছিলেন একটি আধ্যাত্মিক আলোয় ভরা জীবনের দিকে। তিনি ছিলেন দু’টি শাখার মাঝে প্রস্ফুটিত সুগন্ধি ফুল। “যারা ছিলেন ধার্মিকতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল”-এভাবে তিনি নিজেই তাঁর পিতা-মাতার বর্ণনা দিয়েছেন। জিলানে তিনি প্রথমে শরিয়তের জ্ঞান ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর ৪৮৮ হিজরিতে আরও উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বাগদাদে গমন করেন।
আবদুল কাদের জিলানী (র.) বাগদাদে অনেক সম্মানিত আলেমদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। শেখ আবু আল-ওয়াফা আলী ইবনে আকীল হাম্বলী (র.)-এর সান্নিধ্যে নির্জনে ইবাদত করেন। সেখানে তিনি হাম্বলী মাযহাবের জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি এই মাযহাবের একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। তবে ইবনে আকীল ছাড়াও আরও অন্যান্য বিশিষ্ট হাম্বলী আলেমদের কাছ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন :

● আবুল-খাত্তাব মাহফুজ আল-কুলুযানী (র.) : একজন বিশিষ্ট হাম্বলী ফকীহ এবং বাগদাদের একজন অন্যতম আলেম ছিলেন।
● আবুল-হাসান আত-তামিমী (র.) : হাম্বলী ফিকহের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম ছিলেন এবং তাঁর চিন্তাধারায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন।
● আবু সাঈদ আল-মাখযুমী (র.) : তিনি ফিকহ এবং শরিয়তের গভীর জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

এই মহান আলেমগণ জিলানী ৯র (র) এর ফিকহী ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দক্ষতা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বিষয়টি তাঁকে ইসলামী চিন্তাধারায় একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলে।

বড়পীর আবদুল কাদির জিলানীর (র.) জ্ঞানার্জনের পথ রেশমের মতো মসৃণ ছিল না। সেটি ফুল দিয়ে সাজানোও ছিল না। বরং তিনি এমন বহু কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন যা অবর্ণনীয়। বাগদাদে তিনি একসময় দুর্ভিক্ষ এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সময় পার করেছেন। তখন মানুষ গাছের পাতা এবং ময়লার পচনশীল অংশ খেতে বাধ্য হয়েছিল। অভাবগ্রস্তরা খাবারের অবশিষ্টাংশ খুঁজে বের করতে আবর্জনার দিকে ছুটে যেত।

শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (র.) তাঁর জ্ঞানার্জনের পথে যেসব কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি নিজেই সেই মুহুর্তগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর একটি বর্ণনা করে তিনি বলেন: “আমি কাঁটা ঝোপের ফল, শাকসবজির ফেলে দেওয়া অংশ এবং নদীর ধারে থাকা লেটুসের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকতাম। বাগদাদে যখন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন এমন অনেক দিন কেটেছে যখন আমি কোনো খাবার খেতে পারিনি। বরং ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র খুঁজে খেতাম। একদিন প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় নদীর ধারে গিয়েছিলাম। আশা করছিলাম, হয়তো কিছু লেটুস পাতা বা শাকসবজি পাব। তা ভক্ষণ করে ক্ষুধা নিবারণ করব।”

তিনি আরও বলেন: “আমি যখনই কোনো জায়গায় যেতাম, দেখতাম অন্য কেউ আমার আগে সেখানে পৌঁছেছে। আর যখন কিছু পেতাম, তখন দেখতাম দরিদ্ররা সেটির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। আমি তাদের জন্য সেটি ছেড়ে দিতাম দয়ার্দ্র হয়ে। শহরের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি যেকোনো ফেলে দেওয়া জিনিস খুঁজতে থাকতাম। কিন্তু সবসময় দেখতাম যে কেউ আগে থেকেই তা নিয়ে গেছে। অবশেষে আমি বাগদাদের রাইহানিয়ান বাজারে অবস্থিত ইয়াসিন মসজিদে পৌঁছালাম। দুর্বলতা আমাকে এতটাই কাহিল করে ফেলেছিল যে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। মসজিদে প্রবেশ করে এক কোণে বসে পড়লাম। আর তখন আমি প্রায় মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করছিলাম।”

এই গল্পটি আবদুল কাদির জিলানীর (র.) সাথে সম্পৃক্ত একটি ব্যতিক্রমী ঘটনায় শেষ হয়। একদিন মসজিদে একজন পারসিক তরুণ প্রবেশ করল। তার হাতে সুস্বাদু ভাজা মাংস এবং উন্নত মানের রুটি ছিল। সে খেতে শুরু করল। আর জিলানী তখন তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন যে লোকটি হয়তো তাঁকে খাবারের দাওয়াত দিবে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর লোকটির হৃদয়ে দয়া জন্মাল। সে জিলানীকে খাবারের দাওয়াত দিল। প্রথমে জিলানী তা প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু লোকটির বারবার অনুরোধের পর তিনি তা গ্রহণ করলেন। পরে পরিচিত হওয়ার পর জানা গেল লোকটি একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছিল। যা জিলানীর মা পাঠিয়েছিলেন। মায়ের পক্ষ থেকে তাঁর কঠিন অবস্থায় কিছু আর্থিক সহায়তা পাঠানো হয়।

বড়পীর আবদুল কাদির জিলানী (র.) বাগদাদে স্থিত হন। তাঁর শিক্ষক মুবারক ইবনে আলি আল-মাখরামির মাদ্রাসায় নিজ শিক্ষকের স্থলাভিষিক্ত হন। শিক্ষার্থীরা তাঁর পাঠ ও উপস্থিতি থেকে জ্ঞান আহরণ করতে তাঁর কাছে ভিড় জমায়। তাঁর খ্যাতি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি তাঁর শিষ্য মুওয়াফফিকুদ-দীন ইবনে কুদামা তাঁকে এমনভাবে বর্ণনা করেছিলেন যে তিনি ছিলেন “মুহিউদ্দিন” (ধর্মকে পুনর্জীবিতকারী)। তাঁর হাতে নেতৃত্ব এসে পৌঁছেছিল।

ইবনে কুদামা (র.) বলেন: “আমরা ৫৬১ হিজরিতে বাগদাদে প্রবেশ করি। আর তখন সেখানে শায়খ ইমাম মুহিইউদ্দিন আবদুল কাদির (র.) ছিলেন। যার কাছে নেতৃত্ব, জ্ঞান, কর্ম, অবস্থান এবং ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব এসে পৌঁছেছিল। তিনি এতো বেশি জ্ঞান ধারণ করতেন এবং অধ্যয়নরতদের জন্য এতো ধৈর্য ও উদারতা প্রদর্শন করতেন যে একজন বিদ্যার্থীর আর অন্য কারও কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। আল্লাহ তাঁর মধ্যে সুন্দর গুণাবলি এবং সম্মানজনক অবস্থান একত্রিত করেছিলেন। আমি তাঁর পরে তাঁর মতো কাউকে দেখিনি।”

শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (র.) একটি পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করেছিলেন। যেখানে সপ্তাহের তিন দিন সাধারণ শিক্ষা ও বক্তৃতার জন্য বরাদ্দ ছিল। তিনি এই কর্মসূচি টানা চল্লিশ বছর ধরে, ৫২১ থেকে ৫৬১ হিজরি পর্যন্ত পরিচালনা করেন। শিক্ষাদান ও ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি ৩৩ বছর পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। যার ফলে তিনি নিঃসন্দেহে বাগদাদের শায়খ হিসেবে স্বীকৃত হন। তাঁকে দজলা ও ফুরাত নদীর তৃতীয় স্রোতধারা বলে অভিহিত করা হতো। তবে তাঁর জ্ঞানের অফুরন্ত উৎস কখনো শূন্য হয়নি। তাঁর সূফি পন্থার(তরীকায়ে কাদিরিয়া) ঢেউ এখনও বিশ্বের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ছে।

শায়খ আবদুল কাদির জিলানীর (র.) প্রশংসা করেছেন ইবনে তাইমিয়া (যাকে তাসা্‌উফের ব্যাপারে কঠোর বলে ধারণা করা হয়) এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ। এমনকি যারা সুফিবাদের বিরোধী ছিলেন, তারাও তাঁর গুণাবলি ও মর্যাদা স্বীকার করতে বাধ্য হন। ইবনে তাইমিয়া তাঁকে তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শায়খ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সর্বদা শরীয়তের অনুশাসন মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি ও ইচ্ছাকে দমন করে শরীয়তের নিয়মকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি এমন একজন শায়খ ছিলেন যিনি নফসের খেয়াল-খুশি ও ইচ্ছাকে ত্যাগ করার নির্দেশ দিতেন।
ইমাম নববী (র.) আবদুল কাদির জিলানী সম্পর্কে বলেন: “তিনি ছিলেন সুন্দর গুণাবলি ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। পূর্ণ মর্যাদা ও উদারতার সাথে আচরণকারী। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী এবং সবসময় হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। তিনি জ্ঞান ও বুদ্ধিতে পরিপূর্ণ ছিলেন। শরীয়তের কথামালা ও বিধান অনুসরণে খুবই কঠোর ছিলেন। তিনি আলেমদের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করতেন। ধর্ম ও সুন্নাহের অধিকারীদের সম্মান দিতেন। তিনি বিদআত ও গোমরাহির অনুসারীদের অপছন্দ করতেন এবং সত্যের অনুসারীদের ভালোবাসতেন। তিনি আজীবন ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে থাকার চর্চা করেছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছিল উচ্চ স্তরের এবং আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ সংঘটিত হলে তিনি প্রবল রাগান্বিত হতেন। তিনি ছিলেন উদার হৃদয় ও মহান আত্মার অধিকারী। সেরা রীতিতে জীবন যাপনকারী। মোটকথা, তাঁর যুগে তাঁর মতো কেউ ছিল না।”

আবদুল কাদির জিলানী (র.) এমন একটি সূফি পন্থার প্রবর্তন করেন যা পূর্ববর্তী মনীষীদের পন্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তিনি আকিদা (বিশ্বাস) বিশ্লেষণ এবং তার বিভাগগুলো নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী আলেমদের পথ অনুসরণ করেছিলেন। একইভাবে, তিনি ঈমান (বিশ্বাস), আল্লাহর নাম ও গুণাবলির বিষয়ে প্রচলিত আলাপ-আলোচনা করেছিলেন। তবে তাঁর একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল—মানুষ গড়ার কৌশল। তিনি মানুষের স্বভাব সংশোধন, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করায় গুরুত্ব দিতেন। তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে সৎকর্মশীলদের উৎসাহ ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পরিচালিত করতে পারতেন।

বড়পীর আবদুল কাদির জিলানী (র.) তাঁর বই “আল-গুনিয়া” তে তাসাউফ (সূফিবাদ) কে সংজ্ঞায়িত করে বলেন: “এটি হলো আল্লাহর সাথে সত্যবাদিতা এবং সৃষ্টির সাথে উত্তম আচরণ।” তিনি সূফির দায়িত্বগুলো নির্ধারণ করেন বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং আনুগত্যের মধ্যে। পাশাপাশি আল্লাহর পথে সাধনা, ধৈর্য ধারণ এবং তরিকার সহযাত্রী ও দিশারিদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা। তিনি তাসাউফকে কোনো বিশেষ পোশাক বা চিহ্ন হিসেবে দেখেননি। এমন নয় যে এগুলো মানুষদেরকে রাস্তায় আলাদা করে চিনিয়ে দেবে। বরং তিনি তাসাউফকে অন্তরের আলো, আকাঙ্ক্ষার উত্তাপ এবং আল্লাহর পথে সত্যনিষ্ঠ যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

আবদুল কাদির জিলানীর (র.) মতে, একজন সত্যিকারের সূফি হলেন সেই ব্যক্তি যার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থান পবিত্র হয় আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসুলের ﷺ সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে। সত্যিকারের সুফির হৃদয় শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মুক্ত থাকে। এটি শুধুমাত্র পোশাক পরিবর্তন, মুখ ধুলায় লেপা, কাঁধ মেলানো, জিহ্বার উপর আল্লাহর নাম স্মরণ, নেককারদের কাহিনি শোনা, বা আঙুল নাড়িয়ে তাসবিহ করার মাধ্যমে আসে না। বরং এটি আসে আল্লাহর সত্যকে অনুসন্ধানের প্রতি আন্তরিকতা, দুনিয়ার প্রতি বিরাগ, মানুষের প্রতি আসক্তি থেকে হৃদয়কে মুক্ত করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর থেকে নিজেকে বিমুক্ত রাখার মাধ্যমে।

শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (র.) বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। অনেক বই তাঁর নামে সম্পর্কিত হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত কিছু গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

● الغنية لطالبي طريق الحق
(আল-গুনিয়া লিত-তালিবি তরিক আল-হক): এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এখানে তিনি তাসাউফ, আকিদা, এবং ইসলামী নৈতিকতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
● فتوح الغيب
(ফুতুহ আল-গাইব): এই গ্রন্থে তিনি আধ্যাত্মিকতা, আত্মশুদ্ধি, এবং আল্লাহর পথে চলার নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
● الفتح الرباني والفيض الرحماني
(আল-ফাতহ আর-রাব্বানি ওয়াল-ফাইয আর-রাহমানি): এটি তাঁর দেওয়া উপদেশ ও বক্তৃতার সংকলন। এটি অনুসারীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।
● سر الأسرار
(সিররুল আসরার): আধ্যাত্মিক জীবনের গভীর অর্থ ও আধ্যাত্মিকতার মূল বিষয়ে তিনি এই বইয়ে আলোকপাত করেছেন।
এইসব বইয়ে তিনি আধ্যাত্মিক এবং ইসলামী জ্ঞানকে সহজবোধ্য ও গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেন।
শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (র.) বাগদাদের বাজারের বাইরে নিজস্ব কাদেরিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তিনি তাঁর শিক্ষক মুবারক মাখরামি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত মাদ্রাসায় স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর নতুন মাদ্রাসায় মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ও অংশগ্রহণ দেখা যায়। বাগদাদে তাঁর পাঠ ও শিক্ষার প্রভাব ছিল অসাধারণ। এটি বহু বছর ধরে তওবা (পাপ থেকে ফিরে আসা) এবং আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রদর্শনের আহবান জানিয়েছিল। তাঁর শিক্ষার মাধ্যমে বাগদাদের সমাজে প্রচলিত অনেক নৈতিক অবক্ষয় ও বিপথগামিতা দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

মানুষ তাঁর নতুন মাদ্রাসায় তাঁর পিছনে চলতে থাকে। সেখানে ধনী দাতা, দরিদ্র অধিবাসী, শিক্ষিত আলেম এবং ত্যাগী-গুণী ব্যক্তিরা একত্রিত হন। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে। এটি একটি মসজিদ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক ভবন এবং খানকাহ (সূফিদের জন্য বিশেষ আবাস) নিয়ে গঠিত ছিল।

বাগদাদের লোকেরা এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেন। এমনকি নারীরাও তাঁদের দেনমোহর প্রদান করে এই মহান প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখেন। প্রতিষ্ঠানটি একটি কঠোর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। সেখানে ছাত্ররা ইসলামী জ্ঞানে শিক্ষিত হয় যা তাদের আত্মিক বিকৃতি দূর করে, সত্যে তাদের মুখ খুলে দেয়। তাদের হৃদয়কে সত্যের বাতায়নে আপ্লূত করে। ছাত্ররা এই শিক্ষা নিয়ে ফিরে যায় তাদের গ্রামে বা শহরে। তারা হয়ে ওঠে একজন জ্ঞানী, কর্মবীর শিক্ষক এবং কাদেরিয়া তরিকার দূত। শায়খ জিলানী ছিলেন খুবই আগ্রহী যাতে তাঁর ছাত্ররা নিজেদের দেশে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। যাতে তাঁদের শিখন বিস্তৃত হয় এবং এই যাত্রা চলমান থাকে। কাদেরিয়া মাদ্রাসার নির্মাণ সম্পন্ন হয় ৫২৮ হিজরিতে। শায়খ ওই সময় থেকে তাঁর মৃত্যু অব্দি অর্থাৎ ৫৬১ হিজরি পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেন।

কাদেরিয়া মাদ্রাসা থেকে অনেক মাদ্রাসা ও গবেষণাকেন্দ্রের উদ্ভব হয়। এগুলো তাঁর ছাত্র এবং পরে তাঁর সন্তানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান একই শিক্ষাগত পন্থা গ্রহণ করে যা কাদেরিয়া মাদ্রাসার ভিত্তি ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো আদীয়া মাদ্রাসা। এটি প্রতিষ্ঠা করেন আদি ইবনে মুসাফির আল-হেকারী। তিনি ৫৫৭ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়াও কুরাশি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন উসমান ইবনে মারজুক আল-কুরাশি। তিনি ফাতেমীয় রাষ্ট্রের প্রধান চিন্তাগত বিরোধীদের একজন ছিলেন। তিনি পরে আয়ূবিদের জন্য দৃঢ় সমর্থক হয়ে উঠেন, যারা ফাতেমীয়দের পতন ঘটায়। তিনি তাঁর সমর্থক ও ছাত্রদের নূরুদ্দিন বিন মাহমুদ জঙ্গীর নেতৃত্বে সংগঠিত করেন।

কাদেরিয়া মাদ্রাসার মূলনীতিতে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসা হলো আবু সউদ আল-হারিমির মাদ্রাসা। তিনি শায়খ আবদুল কাদির জিলানীর প্রধান শিষ্য এবং তাঁর পরবর্তী নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী ছিলেন। তিনি শায়খের জ্ঞান ও শিক্ষার প্রচার করেছেন এবং অনেক আলেম তাঁর থেকে জ্ঞান লাভ করেছেন। তাঁর বাড়ি ছিল গরিবদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল। সেখানে অনেক মানুষ তাঁর সহানুভূতি ও সাহায্য পেয়েছে।

ইস্পাহানে জাবাইয়্যাহ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় আবদুল্লাহ জাবাইয়ের হাতে। তিনি একজন খ্রিস্টান ছিলেন, পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। শায়খ আবদুল কাদির জিলানীর (র.) কাছে তিনি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ লাভ করেন। সেখানে তিনি ২০ বছর কাটান। এই মাদ্রাসা তাঁকে একজন বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষক এবং মহান শিষ্য হিসেবে গড়ে তোলে। পরে তিনি ইস্পাহানে চলে যান যেখানে তিনি শায়খ জিলানীর জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসার ঘটান। কাদেরিয়া ঐতিহ্যের মূলনীতি দেশটির সীমা অতিক্রম করে বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর কাদেরিয়া তরিকা ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর বিভিন্ন শাখা ও উপপন্থার জন্ম দেয়। বর্তমানে লাখ লাখ মুসলিম এই ধারার অন্তর্ভুক্ত। কাদেরিয়া তরিকার আলেম ও বুজুর্গরা তাঁদের জ্ঞানগত দক্ষতা, ইসলাম প্রচার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র গঠন, এবং ইসলামী নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য সুপরিচিত। কাদেরিয়া তরিকা শিক্ষা এবং রাষ্ট্রের মধ্যে একটি দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করেছে। পাশাপাশি তাসাউফ এবং জিহাদের মধ্যে একটি সংযোগ গড়ে তুলেছে। এর ফলে মুসলমানগণ “ফুতুহুল গাইব” বা অদৃশ্যকে বিজয়ের চেতনা অর্জন করেছে।

[আল জাজিরা আরবী হতে মোহাম্মদ ইকরামুল হক কর্তৃক অনূদিত]

শেয়ার করুন:
  • জনপ্রিয়
  • সাম্প্রতিক

নির্বাচিত

Don`t copy text!