রঈসুল কুররা ওয়াল মুহাদ্দিসীন
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)
আহমদ হাসান চৌধুরী
রঈসুল কুররা, উস্তাযুল মুহাদ্দিসীন, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা মোঃ আবদুুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) আমাদের দেশে এক সুপরিচিত ওলী-আল্লাহর নাম। তিনি আমাদের গৌরব। দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমÐলেও তিনি সুপরিচিত। দীনের বহুমুখী খিদমতই তাঁর ব্যাপক পরিচিতির অন্যতম কারণ। তাঁর জীবন আল্লাহর রাহে সর্বোতভাবে নিবেদিত ছিল। তাঁকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। তিনি জৌনপুরী সিলসিলার প্রখ্যাত বুযুর্গ ও তাসাওউফের উচ্চস্তরে আসীন একজন ওলী-আল্লাহ। ইলমে কিরাতের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য ও বিশ্ববিখ্যাত। ইলমে হাদীসের খিদমতে তাঁর রয়েছে পৌনে এক শতাব্দীর প্রোজ্জ্বল ইতিহাস। সমাজের অসহায়-দুঃস্থ মানুষের সেবায় তাঁর রয়েছে বহুবিধ খিদমত। তিনি সারাটি জীবন মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করেছেন বিভিন্নভাবে। তিনি ছিলেন সুললিত কন্ঠের অধিকারী দাঈ-ইলাল্লাহ, পাশাপাশি একজন সুলেখক ও সমাজ সংস্কারক।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ১৯১৩ সালে (১৩২১ বাংলা) সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলাধীন ফুলতলী গ্রামে এক প্রখ্যাত আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুফতী মাওলানা আবদুল মজীদ চৌধুরী (র.) ছিলেন একজন স্বনামধন্য বিখ্যাত আলিমে দীন ও ফকীহ। তিনি অবিভক্ত ভারতের বাংলা আসাম অঞ্চলের একজন মশহুর বুযুর্গ ছিলেন। তিনি আজীবন মাদরাসায় শিক্ষকতাসহ দীনের অসাধারণ খিদমত আনজাম দেন। আমলে সালিহের মাধ্যমে তাযকিয়ায়ে নাফসের মেহনতে উচ্চাসনে আসীন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি।
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) হযরত শাহজালাল (র.)-এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ কামাল (র.)-এর বংশের অধঃস্তন পুরুষ বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত শাহ আলা বখশ (র.)-এর বংশধর। শাহ আলা বখশ (র.) পর্যন্ত তাঁর বংশ পরম্পরা নিম্নরূপ: শাহ মোহাম্মদ আলা বখশ (র.) > শাহ মোহাম্মদ এলাহী বখশ (র.) > শাহ মোহাম্মদ সাদেক (র.) > শাহ মোহাম্মদ দানেশ (র.) > শাহ মোহাম্মদ হিরণ (র.) > মুফতী মাওলানা আবদুল মজীদ চৌধুরী (র.) > আল্লামা মোঃ আবদুুল লতিফ চৌধুরী (র.)।
শিক্ষা জীবন
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ফুলতলী মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষক ছিলেন তাঁর বংশীয় চাচাতো ভাই মাওলানা ফাতির আলী (র.)। এ সময় তিনি কারী সৈয়দ আলী সাহেবের নিকট কিরাত শিক্ষা গ্রহণ করেন। সে সময় তাঁর মুহতারাম পিতা গঙ্গাজল মাদরাসার প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁরই সুযোগ্য শাগরিদ হাইলাকান্দি রাঙ্গাউটি মাদরাসার সুপার, প্রখ্যাত ওলী মাওলানা আবদুুর রশিদ ছাহেব তাঁর শ্রদ্ধেয় উস্তাদের নিকট ফুলতলী ছাহেবকে এ মাদরাসায় ভর্তি করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। ফলে ১৩৩৬ বাংলায় তিনি এ মাদরাসায় (হাইলাকান্দি) ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। অতঃপর ১৩৩৮ বাংলায় বদরপুর সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হয়ে সুনামের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
উচ্চ শিক্ষা ও ইলমে হাদীসের সনদ অর্জন
মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনান্তে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) তাঁর উস্তাদ ও মুরশিদ হযরত মাওলানা আবূ ইউসূফ শাহ মোহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরী (র.)-এর নির্দেশ মুতাবিক উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ভারতের বিখ্যাত দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরে ভর্তি হয়ে ফনুনাত সম্পন্ন করেন। পরে ইলমে হাদীসের শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে মাতলাউল উলূম মাদরাসায় ভর্তি হন এবং সুনামের সাথে অধ্যয়নের পর হাদীসের চ‚ড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৩৫৫ হিজরী সনে হাদীসের সনদ লাভ করেন। এ মাদরাসায় তাঁর হাদীসের উস্তাদ ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত আল্লামা খলীলুল্লাহ রামপুরী (র.) ও আল্লামা ওয়াজীহ উদ্দীন রামপুরী (র.) প্রমুখ। ইলমে হাদীস ছাড়াও তিনি ইলমে তাফসীর ও ফিকহ শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
ইলমে কিরাত
ইসলামী জ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘ইলমে কিরাত’। ইলমে কিরাতে তাঁর সুযোগ্য শিক্ষক ছিলেন স্বীয় পীর ও মুরশিদ হযরত আবূ ইউসূফ শাহ মোঃ ইয়াকুব বদরপুরী (র.)। তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) কিরাত বিষয়ে আরো শিক্ষা গ্রহণ করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত কারী হযরত মাওলানা হাফিয আবদুর রঊফ করমপুরী শাহবাজপুরী (র.)-এর কাছ থেকে। শাহবাজপুরী (র.) ছিলেন হযরত ইরকসূস মিসরী (র.)-এর ছাত্র। ১৯৪৪ ইং (১৩৫১ বাংলা) সনে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) মক্কা শরীফ গমন করে ইলমে কিরাতের আরো উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন শায়খুল কুররা হযরত আহমদ হিজাযী (র.)-এর কাছ থেকে। আহমদ হিজাযী (র.) ছিলেন হারাম শরীফের ইমামগণের পরীক্ষক ও তৎকালীন বিশ্বের খ্যাতিমান কারীগণের উস্তাদ। তিনি শায়খুল কুররা হযরত আহমদ হিজাযী (র.)-এর কাছ থেকেও ১৯৪৬ ইং (১৩৫৩ বাংলা) সনে ইলমে কিরাতের সনদ লাভ করেন।
ইলমে তরীকত
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ছাত্রজীবনেই তরীকতের বায়আত হন ও খিলাফত লাভ করেন। ইলমে তাসাওউফে তাঁর মুরশিদ হযরত মাওলানা আবূ ইউসুফ শাহ মোঃ ইয়াকুব বদরপুরী (র.)। হযরত বদরপুরী (র.) ছিলেন তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলিমে দীন ও সর্বজনমান্য বুযুর্গ। তিনি হাদিয়ে বাঙ্গাল হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র.)-এর সুযোগ্য ছাহেবজাদা ও খলীফা হযরত হাফিয আহমদ জৌনপুরী (র.)-এর খলীফা ছিলেন। বায়আত হওয়ার পর থেকে আপন পীর ও মুরশিদ হযরত বদরপুরী (র.)-এর নির্দেশনা হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) যথাযথভাবে পালন করে যেতে থাকেন। পীর ও মুরশিদের তা’লীম-তাওয়াজ্জুহের এক পর্যায়ে ছাত্রাবস্থায়ই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৩৩৯ বাংলা সনে তিনি খিলাফত লাভ করেন। এটি ছিল হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহর অনন্য গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি।
কর্ম জীবন
হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর কর্মজীবন দীনের বহুমুখী খিদমতে নিবেদিত ছিল। তিনি সারা জীবন আল কুরআনুল কারীমের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা দিয়েছেন, হাদীসে নববীর দারস দিয়েছেন, তরীকতের তা’লীমের মাধ্যমে মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ করেছেন, আর্ত মানবতার সেবা করেছেন। তাঁর বহুমুখী খিদমত সম্পর্কে এখানে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হলো।
ইলমে হাদীসের খিদমত
কর্মজীবনে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ১৯৪৬ সালে বদরপুর আলিয়া মাদরাসায় যোগদান করে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। এরপর গাছবাড়ি জামেউল উলূম আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করে ছয় বছর সুনামের সাথে পাঠদান করেন। তিনি এ সময় ভাইস প্রিন্সিপাল ও প্রিন্সিপাল হিসেবে গুরুদায়িত্ব আনজাম দেন। এরপর সুদীর্ঘকাল সৎপুর আলিয়া মাদরাসা ও ইছামতি আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে ইলমে হাদীসের খিদমত আনজাম দেন। তিনি এসব প্রতিষ্ঠানে বুখারী, নাসাঈ, ইবন মাজাহ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইতকান, নূরুল আনোয়ার, আকাইদ, হিদায়া, জালালাইন প্রভৃতি উঁচু পর্যায়ের কিতাবাদি দক্ষতার সাথে পাঠদান করেন। ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত সপ্তাহে দু’দিন ফুলতলী আলিয়া মাদরাসায় কামিল জামাতে তিনি বুখারী শরীফের দারস দিতেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে পয়গামে ইলাহী ও তা’লীমে নববীর অমিয় সুধা পানে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী।
হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) দীর্ঘ প্রায় পৌনে একশতাব্দী ইলমে হাদীসের খিদমত করেছেন। বদরপুর আলিয়া মাদরাসা থেকে শুরু হওয়া খিদমতের ধারা ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তাঁর নিকট হাদীসের দারস গ্রহণকারী কিছু ব্যক্তিকে ২৭ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে হাদীস শরীফের সনদ প্রদান করা হয়। শুধু নির্বাচিত আবেদনকারীগণই সনদ লাভ করেন। এ উপলক্ষে সনদ গ্রহণকারী শাগরিদবৃন্দের পক্ষ থেকে ‘রাহী মদীনা’ নামে একটি স্মারকও প্রকাশিত হয়।
ইলমে কিরাতের খিদমত
স্বপ্নে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইঙ্গিতেই এ খিদমত শুরু হয়। সমকালীন খ্যাতনামা আলিম ও বুুযুর্গ হযরত আবদুন নূর গড়কাপনী (র.) স্বপ্নে ইঙ্গিত পেয়ে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর নিকট কিরাত শিক্ষার আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) আদম খাকী (র.) (৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম)-এর মাযার সংলগ্ন মসজিদে কিরাতের দারস শুরু করেন। এ ঘটনাটি নিম্নরূপ :
হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) মক্কা শরীফ হতে ফিরে পুনরায় যথারীতি বদরপুর আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষাদান শুরু করেন। একদিন হযরত ছাহেব কিবলাহ ক্লাসে ছাত্রদের দারস দেয়ার সময় সেখানে হযরত আবদুন নূর গড়কাপনী (র.) তাশরীফ নিলেন। সমকালীন খ্যাতনামা আলিম ও বুুযুর্গ ছিলেন তিনি। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ তাঁকে সমাদরে পাশে বসতে অনুরোধ করে পাঠদানে ব্যস্ত হলেন। ক্লাসের সময় শেষ হলে ছাহেব কিবলাহ তাঁর কুশলাদি ও আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, সর্বসাধারণ তো দূরের কথা এতদঞ্চলের বেশ কিছু সংখ্যক আলিমেরও কিরাত শুদ্ধ নয়। তাই ছাহেব কিবলাহ দারসে কিরাতের জন্য অন্তত সপ্তাহে ঘন্টাখানেক সময় যেন দেন আমাদের। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ জবাবে বললেন, আমার হাতে সময় একেবারে কম, বিশেষ করে ক্লাসে ছাত্রদের পাঠদানের আগে নিজে ভালোভাবে তা দেখে নিতে হয়, তাই সময় দেয়া মোটেই সম্ভব নয়। একথার পর আবদুন নূর ছাহেব চলে গেলেন। পরদিন ঠিক একইভাবে উপস্থিত হয়ে এ কথারই পুনরাবৃত্তি করলে ছাহেব কিবলাহ আবারও অপারগতা প্রকাশ করলেন। তখন হযরত আবদুন নূর (র.) বললেন, আমি নিজে থেকে আপনার নিকট আসিনি। বড় জায়গা থেকে নির্দেশ পেয়েই তবে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ তখন স্বীয় মুরশিদ হযরত বদরপুরী (র.)-এর নির্দেশ কিনা জানতে চাইলে হযরত আবদুন নূর (র.) বললেন, না আরো বড় জায়গা থেকে নির্দেশ পেয়েছি। ছাহেব কিবলাহর অনুরোধে তিনি বর্ণনা করলেন, ‘স্বপ্নে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা গেল। আরয করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কুরআন শরীফের তিলাওয়াত শুনতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াত করে শুনালেন। আরয করলাম, এই কিরাত কিভাবে শিখব? তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডান দিকে ইশারা করলেন। সেদিকে চেয়ে দেখা গেল, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি আপনি।’ একথা শুনার সাথে সাথে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ কেঁদে ফেললেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার ১২টার পরে নিকটবর্তী হযরত আদম খাকী (র.) (৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম)-এর মাযার সংলগ্ন মসজিদে কিরাতের দারস দেয়ার ওয়াদা দিলাম।’ এভাবেই ছাহেব কিবলাহর ইলমে কিরাতের খিদমতের স‚ত্রপাত। এরপর তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে পায়ে হেটে, ঘোড়ায় চড়ে, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবৈতনিকভাবে কিরাতের দারস দিয়েছেন। (নির্দেশিকা, দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট, প্রধানকেন্দ্র ফুলতলী ছাহেব বাড়ি)
১৯৫০ ইংরেজি সনে ছাহেব কিবলাহ নিজ বাড়িতে ইলমে কিরাতের দারস প্রথম চালু করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষকদের সুবিধার্থে ছুটির অবসরকালীন রামাদান মাসকে কিরাত শিক্ষার জন্য বেছে নেন তিনি। প্রতি বছর রামাদানে ছাহেব কিবলাহ নিজ বাড়িতে শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নিজ খরচে বহন করতে থাকেন। দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি সবাইকে তা’লীম দিয়ে এবং সমগ্র কুরআন শরীফ নিজে শুনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে তবেই সনদ প্রদান করতেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অন্যান্য স্থানে শাখাকেন্দ্র অনুমোদন ও একটি বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই ৭ সদস্য বিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের সদস্যদের অনুরোধক্রমে ছাহেব কিবলাহ’র ওয়ালিদ মুহতারাম হযরত মাওলানা মুফতী আবদুল মজীদ চৌধুরী (র.)-এর নামানুসারে এ প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় ‘দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’। ছাহেব কিবলাহ তাঁর ভ‚-সম্পত্তির বিশাল অংশ (প্রায় ৩৩ একর) এ ট্রাস্টের নামে ওয়াকফ করে দিয়েছেন। বর্তমানে এ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় দুই হাজার শাখা কেন্দ্র দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে।
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর নিকট থেকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অগণিত মানুষ কিরাত শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এর সঠিক পরিসংখ্যান দুঃসাধ্য। ২০০২ সালের ৩১ মার্চ নির্ধারিত শর্তের ভিত্তিতে (তৃতীয় বিভাগ ব্যতীত) তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণকারী প্রায় চার হাজার কারী ছাহেবকে একসাথে সনদ ও পাগড়ী প্রদান করা হয়। এ উপলক্ষে দৈনিক ইনকিলাবে বিশেষ ক্রোড়পত্রও ছাপা হয়। সেখানে বাংলাদেশের তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও কয়েকজন মন্ত্রীর বাণী স্থান পায়।
সামাজিক খিদমত
হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) দীনী খিদমতে প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম সম্পাদনে যেমন শীর্ষস্থানীয়, তেমনি সমাজসেবা তথা দেশ ও দশের খিদমতে তাঁর অবদান আদর্শস্থানীয়। তিনি নীরবে-নিভৃতে সারা জীবন খিদমতে খালক তথা সৃষ্টির সেবা করে গেছেন। অসহায় এতীম, মিসকীন, বিধবা, গৃহহীন, বস্ত্রহীন সবার দুঃখ-বেদনাকে আজীবন নিজের করে দেখেছেন। এতীমদের লালন পালন ও সুশিক্ষার জন্য তিনি গড়েছেন এতীমখানা। শত শত এতীমের অভিভাবকত্ব করে গেছেন ইন্তিকাল পর্যন্ত। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এতীমখানায় দেড় হাজারেরও অধিক এতীম প্রতিপালিত হচ্ছে। গরীব-অসহায়দের চিকিৎসার সুবিধার্থে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন বিনামূল্যে চিকিৎসা কেন্দ্র বা ডিসপেন্সারি। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হয়েছে লঙ্গরখানা, বিধবা ও পঙ্গু পুনর্বাসন কেন্দ্র, গৃহ নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপন, বৃক্ষরোপণসহ নানা প্রকল্প। তাঁর বড় ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী শুরু থেকেই এসবের তত্ত¡াবধান করছেন।
শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান সুবিদিত ও সর্বমহলে প্রশংসিত। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে, মহাদেশের গÐি পেরিয়ে তাঁর খিদমত ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক পরিমÐলে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন অসংখ্য মাদরাসা-মক্তব, পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন শত শত মানব কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের। গরীব ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রকল্প, নিজ খরচে শিক্ষাদান তথা বিনামূল্যে শিক্ষারও সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি।
সামাজিক শৃঙ্খলা ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় স্থানীয় বিচার-সালিসে ন্যায়বিচার পেতে লোকজন তাঁর দ্বারস্থ হতো। চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, অন্যায়-অত্যাচার এগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো ভ‚মিকায় সামাজিক শান্তি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা স্থানীয় হিন্দুরাও তাঁর ন্যায় বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা ও সাহায্য-সহযোগিতায় উপকৃত হয়েছে।
তিনি গরীব ও অভাবী মানুষকে উদার হস্তে সাহায্য করতেন। বিপদের সময় তাদের পাশে দাঁড়াতেন। বিশেষ করে বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে গরীবদের মাঝে চাল, ডাল, কাপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিতরণ করে কিছুটা হলেও মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করতেন। মাদরাসা, মক্তব, মসজিদ, স্কুল প্রতিষ্ঠা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ ইত্যাদিতেও জমি দান করে এলাকার উন্নয়নে তিনি সব সময় রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা। সময়ে সময়ে তাঁর সময়োপযোগী পদক্ষেপে বড় বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে, সংকট বা সংঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছে মানুষের জান-মাল। তিনি সব সময়ই জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রেখেছেন।
দীন ইসলামের এক মর্দে মুজাহিদ ছিলেন হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)। দীনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন। দীনের প্রতি কোনো আঘাত আসলে তিনি কখনো নীরব থাকতেন না। অমিত সাহস বুকে নিয়ে বজ্রকণ্ঠে এর প্রতিবাদ করতেন। যখনই দেশীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলাম ও মুসলমানের উপর কোনো আঘাত আসতো, তিনি এর প্রতিবাদে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে দীনের স্বকীয়তা রক্ষার আন্দোলনে তিনি সিপাহ্সালারের ভূমিকা পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-ভারতের আসাম অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষার আন্দোলন, পাকিস্তান আমলে ফজলুর রহমান বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ আমলে তাসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলন, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ বিরোধী আন্দোলন, আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে দীনী খিদমত আন্জাম দেয়ার লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তুলেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন শত শত মসজিদ, মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠানের। দেশে এসবের মধ্যে রয়েছে- দারুল কিরাত মজিদিয়া ট্রাস্ট (১৯৫০), লতিফিয়া এতিমখানা (১৯৭২), হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদ্্রাসা (১৯৮৩), লতিফিয়া কমপ্লেক্স (২০০২), যার অধীনে রয়েছে আল কুরআন মেমোরাইজিং সেন্টার, ফুলতলী ইসলামিক কিন্ডারগার্টেন ও ফুলতলী ইসলামিক প্রি ক্যাডেট একাডেমী, বাংলাদেশ আনজুমানে মাদারিছে আরাবিয়া (১৯৬৪), বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ (১৯৭৯), বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া (১৯৮০), লতিফিয়া কারী সোসাইটি, ইয়াকুবিয়া হিফযুল কুরআন বোর্ড (২০০৬)। এছাড়া তিনি আজীবন বাদেদেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। মাদরাসা শিক্ষকদের অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন ও আর্ত-মানবতার সেবায় নিবেদিত সংগঠন মুসলিম হ্যান্ডস বাংলাদেশ-এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।
যুক্তরাজ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন
হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর দীনী খিদমতের পরিধি বাংলাদেশ, ভারত তথা সমগ্র উপমহাদেশ ছাড়িয়ে সুদূর ইউরোপ, আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ইলমে কিরাত, ইলমে হাদীস, ইলমে তাসাওউফসহ সব ধরনের খিদমত পরিচালনার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে বহু সংখ্যক দীনী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- দারুল হাদীস লাতিফিয়া। ১৯৭৮ সালে ‘মাদরাসা-ই-দারুল কিরাত মাজিদিয়া’ নামে পূর্ব লন্ডনের নিউ রোডে এটি শুরু হয়, ১৯৮১ সালে ক্যানন স্ট্রিট রোডে স্থানান্তরিত হয় এবং ২০০৫ সালে বেথনাল গ্রীনে বৃহত্তর পরিসরে এর কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় এর নতুন নামকরণ হয় দারুল হাদীস লাতিফিয়া। এটি বর্তমানে একটি পুর্ণাঙ্গ কামিল মাদ্রাসা। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক ছাত্র ইসলামী শিক্ষায় অধ্যয়নরত। এখানে রয়েছে ব্রিটেনের ন্যাশনাল কারিকুলাম ও ইসলামী শিক্ষার সুষম সমন্বয়, যা মুসলিম সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিনির্মাণে যুগান্তকারী ভ‚মিকা রাখছে। কামিল জামাত সমাপ্ত করে অনেক ছাত্র উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার জন্য মিশরের বিশ্ববিখ্যাত আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশীপ পেয়ে সেখানে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মধ্যে রয়েছে- আনজুমানে আল ইসলাহ ইউকে (১৯৭৮), লতিফিয়া উলামা সোসাইট ইউকে (১৯৮৭), লতিফিয়া কারী সোসাইট ইউকে (১৯৯৩), আল ইসলাহ ইয়ূথ ফোরাম (১৯৯৯), আল মাজিদিয়া ট্রাস্ট ইউকে, আল মাজিদিয়া ইভিনিং মাদ্্রাসা, আল মাজিদিয়া উইকেন্ড ইভিনিং মাদ্্রাসা, লাতিফিয়া গার্লস স্কুল (২০০৭)। এছাড়া আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর উৎসাহ-অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় যুক্তরাজ্যে অনেক মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর নির্দেশনায় এবং তাঁর নিকট থেকে কিরাতের সনদপ্রাপ্ত কারী ছাহেবগণের পরিচালনায় ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষাদানের নিমিত্ত গড়ে উঠেছে অনেক কিরাত প্রশিক্ষণকেন্দ্র। দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের সিলেবাস অনুসরণে এ সকল কেন্দ্রে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা দেয়া হয়। স্কুল-কলেজের ছুটির সময়ে ছোট ছেলে-মেয়ে থেকে নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও এ কিরাত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। লন্ডন, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লুটন, টিপটন, ওল্ডহাম, কভেন্ট্রিসহ বিভিন্ন শহরে এ সকল কিরাত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু রয়েছে।
আমেরিকায় আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর খিদমত
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান শহরে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-ইসলাহ ইসলামিক সেন্টার। তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের চীফ প্রেট্রন। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে আল ইসলাহ মসজিদ নামে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাদরাসা রয়েছে। আমেরিকার এ মসজিদে মাইকে আযান দেয়া হয়ে থাকে। ভোটা-ভোটি ও আদালতের রায়ের মাধ্যমে মসজিদটি প্রকাশ্যে আযানের অনুমতি লাভ করে। ২০০১ সালে তাঁর দু‘আ ও নির্দেশনায় নিউইয়র্ক সিটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নিউইয়র্ক হাফিযিয়া মাদরাসা। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় নিউইয়র্ক সুন্নিয়া হাফিযিয়া মাদরাসা। হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর ইন্তিকালের পর ২০০৯ সালে আমেরিকার নিউজার্সি শহরে তাঁর নামে শুরু হয়েছে শাহজালাল লতিফিয়া মাদরাসা। এ ছাড়া ছাহেব কিবলাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মুরিদীন, মুহিব্বীন তাঁরই দু‘আ ও ইজাযতে আমেরিকায় অনেক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ভারতে খিদমত
ভারতেও আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর বহুবিধ দীনী খিদমতের ধারা চালু রয়েছে। তাঁর কর্মজীবনের সূচনাও ভারতেই (বদরপুরে)। জীবনের প্রথম দিকে তিনি তাঁর মুরশিদ হযরত আবূ ইউসুফ শাহ মোঃ ইয়াকুব বদরপুরী (র.)-এর প্রতিষ্ঠিত বদরপুর সিনিয়র মাদরাসায় শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ করেন। হাদীস শাস্ত্র পাঠদানের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে একদিন বদরপুরের হযরত শাহ আদম খাকী (র.)-এর মোকাম (মাযার) সংলগ্ন মসজিদে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষাদান করতেন।
ভারতের আসাম রাজ্যে দীনী শিক্ষাকে ধ্বংস করার হীন ষঢ়যন্ত্রে যখন সরকারিভাবে মাদরাসা শিক্ষাকে সিভিল স্কুল বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন ছাহেব কিবলাহ নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দীনী শিক্ষার মান উন্নয়ন কল্পে পৃথক মাদরাসা বোর্ড স্থাপনের দাবি নিয়ে আন্দোলনের ডাক দেন। সে আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য ছাহেব কিবলাহ-এর প্রতি গুলির নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু উলামা সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সমর্থন ছাহেব কিবলাহ-এর এ আন্দোলনকে আরও জোরদার করে। ফলে তদানীন্তন আসামের প্রাদেশিক সরকার বাধ্য হয়ে তৎকালীন মন্ত্রী আবদুুল মুতলিব মজুমদার সাহেবের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ শামসুল হুদা সাহেব। এই কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৫৫ সালে আসামে পৃথক মাদরাসা বোর্ড স্থাপিত হয়। আজ পর্যন্ত এই মাদরাসা বোর্ড আসামে দীনী শিক্ষার উন্নয়ন, প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে।
হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহর উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় সুদূর অতীত থেকে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে পবিত্র কুরআন শরীফের বিশুদ্ধ পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে ছাহেব কিবলাহর অনুমতিক্রমে ‘লতিফিয়া দারুল কিরাত সমিতি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা প্রতি বছর রামাদান মাসে বিভিন্ন স্থানে দারুল কিরাতের শাখাকেন্দ্র স্থাপন করে দীনী খিদমত আনজাম দিচ্ছে।
পারিবারিক জীবন
পারিবারিক জীবনে তিনি ১৩৪৫ বাংলায় তাঁর পীর ও মুরশিদ হযরত মাওলানা আবূ ইউসুফ শাহ মোঃ ইয়াকুব বদরপুরী (র)-এর তৃতীয়া কন্যা মুহতারামা মুছাম্মত খাদিজা-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ তরফে চারজন ছাহেবজাদা ও তিন ছাহেবজাদী রয়েছেন। তাঁরা হলেন হযরত আল্লামা মোঃ ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী, হযরত আল্লামা মোঃ নজমুদ্দীন চৌধুরী, মোছাম্মত করিমুন্নেছা চৌধুরী, হযরত মাওলানা মোঃ শিহাবুদ্দীন চৌধুরী, মোছাম্মত মাহতাবুন্নেছা চৌধুরী, মোছাম্মত আফতাবুন্নেছা চৌধুরী, মুফতি মাওলানা মো: গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। আল্লাহর রেযামন্দি তথা ইবাদত-বন্দেগীর এক পর্যায়ে বদরপুরী ছাহেব কিবলাহর এই ছাহেবজাদীর অন্তরে সংসারের প্রতি বিরাগ সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে ছাহেব কিবলাহ তাঁর পীর ও মুরশিদ হযরত বদরপুরী (র)-এর নির্দেশে ফুলতলী গ্রামের মরহুম আবদুুর রশিদ খানের কন্যা মুহতারামা নেহারুন নেছার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ তরফে তিন জন ছাহেবজাদা রয়েছেন। তাঁরা হলেন- মাওলানা মুহাম্মদ কমরুদ্দীন চৌধুরী, হাফিয মাওলানা মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন চৌধুরী ও মাওলানা মুহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী।
রচিত গ্রন্থাবলী
বহুমুখী ব্যস্ততার মধ্যেও আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) তাফসীর, তাজবীদ, সীরাত, তাসাওউফ ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কয়েকখানা গ্রন্থ রচনা করেছেন। নীচে তার রচিত গ্রন্থাবলীর পরিচিতি প্রদত্ত হলো।
১. আততানভীর আলাত তাফসীর : এটি পবিত্র কুরআনুল করীমের প্রথম দু’ পারার তাফসীর গ্রন্থ। উর্দু ভাষায় সংকলিত এ তাফসীর দু’খÐে সমাপ্ত। ছোট ছাহেবজাদা মাওলানা মুহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী এটি অনুবাদ করেছেন।
২. মুন্তাখাবুস সিয়র : তিন খÐে প্রকাশিত সীরাতগ্রন্থ। এটি সীরাত বিষয়ে একখানা অনবদ্য কিতাব। এ গ্রন্থের প্রথম খÐের বঙ্গানুবাদক বড় ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা মোঃ ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। পরবর্তীতে এটি অনুবাদ করেছেন ছোট ছাহেবজাদা মাওলানা মুহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী।
৩. আনওয়ারুস সালিকীন : উর্দু ভাষায় লিখিত তাসাওউফ বিষয়ক গ্রন্থ। এর অনুবাদ করছেন বড় ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা মোঃ ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী।
৪. আল খুতবাতুল ইয়াকুবিয়া : আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা নির্ভর বার চাঁদের খুতবা। এর মূল আরবী ইবারতের সাথে বাংলা অনুবাদও রয়েছে। বাংলা অনুবাদ করেছেন এ.কে.এম ফজলুর রহমান মুন্সী।
৫. নালায়ে কলন্দর : হামদ, না’ত, মুনাজাত ও আধ্যাত্মিক বাণী ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ উর্দু গীতিকাব্য হলো নালায়ে কলন্দর। প্রথম অনুবাদ করেন কবি সৈয়দ শামসুল হুদা। পরবর্তীতে গীতিকবিতার আদল ঠিক রেখে এটি অনুবাদ করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা কবি রূহুল আমীন খান।
৬. শাজারায়ে তায়্যিবাহ : ছাহেব কিবলাহর তরীকতের সিলসিলা পরিচিতি সম্বলিত বই। এটি উর্দু ভাষায় সংকলিত। এ বইটিও বাংলায় অনূদিত হয়েছে।
৭. নেক আমল : দৈনন্দিন জীবনের আমলিয়াতের রূপরেখা সমৃদ্ধ একখানা পুস্তিকা।
৮. আল-কাউলুছ ছাদীদ : ইলমে তাজবীদ বিষয়ে উর্দু ভাষায় লিখিত অনন্য গ্রন্থ। এটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন বড় ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা মোঃ ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। এটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগ ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া-এর আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে রেফারেন্সগ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
ইন্তিকাল
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ ১৬ জানুয়ারি ২০০৮ ঈসায়ী, ৬ মুহাররম ১৪২৯ হিজরী, ৩ মাঘ ১৪১৪ বাংলা বুধবার প্রথম প্রহরে (রাত ২টায়) সিলেট শহরের সুবহানীঘাটস্থ তাঁর প্রতিষ্ঠিত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন বাসভবনে ইন্তিকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ইন্তিকালের কিছুক্ষণ পর ফজরের আগেই তাঁকে নিজ বাড়ি ফুলতলীতে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐ দিন বিকাল ৪টার সময় বাড়ির দক্ষিণ পার্শ্বস্থ বালাই হাওরে তাঁর নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় মুরীদান-মুহিব্বীনসহ লাখো লাখো মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাযার নামাযে ইমামতী করেন বড় ছাহেবজাদা আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহকে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ছাহেব বাড়ি জামে মসজিদের উত্তর পাশে কবর দেয়া হয়েছে।
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) সারা জীবন দীনের খিদমতে অতিবাহিত করেছেন। শেষ জীবনে বয়সের ভারে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেলেও এ খিদমত থেকে তিনি বিরত হননি। বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও তিনি প্রায় নিয়মিতই ইসলামী মাহফিলে যোগ দিতেন। এসব সভা সম্মেলনে তাঁর অনুসারী মুরীদানসহ উপস্থিত জনগণকে ইসলামী শরীআত ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা অনুযায়ী জীবন গঠনের জন্য বিস্তারিত পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতেন। অসাধারণ বাগ্মী হিসেবে তাঁর পরিচয় সুবিদিত ছিল। তাঁর বাগ্মিতার বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁর বক্তব্য বাস্তবোচিত, যুক্তিসিদ্ধ ও পুরোপুরি তথ্যনির্ভর থাকতো। তিনি ছাহিবে কারামত ছিলেন। তাঁর জীবনে বহু অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো কারামতের পিছনে ছুটতেন না। তাঁর কারামত প্রকাশিত হোক, এটা তিনি চাইতেন না। তাঁর সামনে কারামতের কথা বলার সাহসও কেউ করতেন না। তিনি সবসময় কারামতের চেয়ে শরী‘আতের উপর ইসতিকামাতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। জীবনের ব্যাপারে হতাশ রোগীর রোগমুক্তি, দু‘আ ও তাবিযের বদৌলতে হারানো মানুষ ফিরে পাওয়া, ডুবন্ত লাশ ভেসে উঠা, নিঃসন্তান দম্পত্তির সন্তান লাভসহ হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) থেকে প্রকাশিত নানা কারামত দেশ-বিদেশে মানুষের মুখে মুখে আজো আলোচিত।
তিনি একজন মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক ছিলেন। আল কুরআনুল কারীমের বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের বিস্তার তাঁর সবচেয়ে বড় সংস্কারমূলক কাজ। তা ছাড়া তিনি সমাজে প্রচলিত নানা ভুল আকীদা-বিশ্বাসের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা-বিশ্বাসকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিদআত-কুসংস্কার দূর করেছেন। সর্বোপরি তিনি মুসলমানদের শরীআত মুতাবিক জীবন গঠন ও পরিচালনার কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করে গেছেন। তাঁর জীবন আমাদের জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস।
[আহমদ হাসান চৌধুরী কৃত ‘আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) : সংক্ষিপ্ত জীবনী’ থেকে সংগৃহীত]