হযরত খাদিজা (রা.)

পৃথিবীর সকল রমণীর মধ্যে হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন পেয়ারা নবী (সা.)-এর সবচেয়ে কাছের রমণীদের মধ্যে অন্যতম। কেননা রাসূল (সা.)-এর সহধর্মিনীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশী সময় রাসূল (সা.)-এর খিদমতে অতিবাহিত করার সুযোগ পেয়েছেন। রাসূল (সা.) যখন খাদিজা (রা.)-কে বিয়ে করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদিজা (রা.) যখন ইন্তিকাল করেন তখন রাসূল (সা.)-এর বয়স ছিল ৫০ মতান্তরে ৫২ বছর এ সুদীর্ঘ ২৫ মতান্তরে ২৭ বছর দাম্পত্যকালে রাসূল (সা.) অন্য কোন রমণীর সাহচর্য্য লাভ করেননি। হযরত খাদিজাতুত্তাজেহরা (রা.) একদিকে যেমন রাসূলে করীম (সা.)-এর প্রথম সহধমির্নী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন, তেমনিভাবে অর্জন করেন বিশ্বের প্রথম মুসলিম রমণী হওয়ার গৌরব। ৫৫৫ ঈসায়ী সালে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল খুয়াইলিদ এবং মাতার নাম ছিল ফাতেমা। মাতা-পিতা উভয়ের বংশ পরিক্রমায় তিনি ছিলেন অভিজাত কুরাইশ বংশীয়। যে বংশের আদি পুরুষ ছিলেন খলিলুল্লাহ। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর বংশেই জন্মগ্রহণ করেন হাবিবুল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)।

শৈশব ও শিক্ষা-দীক্ষা ঃ শৈশব থেকেই হযরত খাদিজার (রা.) চরিত্রে মু’মীনকুলের জননী সুলভ আচারণ লক্ষ্য করা যায়। কেননা তিনি ছিলেন অন্য সকল সাধারণ শিশু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সাধারণ শিশুদের মত খেলা-ধূলা, আনন্দ-ফ‚র্তিতে মেতে উঠে তিনি আত্মহারা হয়ে উঠতেন না। বড়দের কাজ কর্ম দেখে তা আয়ত্ব করা ছিল তার শৈশবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন, অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী। বর্তমান যুগের মত সে সময়ে শিক্ষা অর্জনের তেমন সুবর্ণ সুযোগ ছিল না বরং নারী শিক্ষার ব্যাপারে ছিল নানা প্রতিক‚লতা। এসব বাঁধা সত্তে¡ও খাদিজা (রা.) যে সম্পূর্ণ নিরক্ষর ছিলেন তা নয়। তাওরাত, ইনযীল ছিল সে সময়ে বৈধ আসমানী কিতাব। এসব আসমানী কিতাব বেশ ভালভাবে অধ্যয়ন করতেন। খাদিজার (রা.) পিতা খুইয়ালিদ। পিতার সান্নিধ্য থেকে তাওরাত, ইনযীলের যাবতীয় উত্তম বাণী খাদিজা (রা.) আয়ত্ব করেছিলেন। এসব আসমানী কিতাবে লেখা আদেশ নিষেধ মেনে চলে অতিঅল্প বয়সেই খাদিজা (রা.) বেশ ধর্ম পরায়না হয়ে উঠেছিলেন। রাসূল (সা.)-এর সত্যপরায়ণতার জন্য লোকে যেমন তাকে আল আমীন বলে ডাকত। তেমনি খাদিজার (রা.) নিখুঁত ধার্মিকতার জন্য লোকে তাকে তাহেরা বলে ডাকত।

বিয়ে ঃ নবী করীম (সা.)-এর সাথে পরিনয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে হযরত খাদিজা (রা.) দুই মতান্তরে তিনজন স্বামীর সাহচর্য্য লাভ করেন। তাঁর প্রথম স্বামীর নাম ছিল নাবাস ইবনে জুরারা তামিমি। তিনিও খাদিজার (রা.) বংশীয়া অর্থাৎ কুরাইশ বংশের। এ ঘরে খাদিজার (রা.) দু’টি পুত্র সন্তান হয়। প্রথম পুত্রের নাম হিন্দ ও এবং দ্বিতীয় পুত্রের নাম হালা। তাঁর প্রথম স্বামী তামিমী অবশ্য দ্বিতীয় পুত্রের নাম অনুসারে পরবর্তীতে আবু হালা তামিমী নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। অতি অল্প বয়সেই তামিমী দু’পুত্র সন্তান রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন। হযরত খাদিজা (রা.)-এর দ্বিতীয় স্বামী হচ্ছেন আতিক বিন আয়েদ মাখযুমী। এ স্বামীর ঘরে আল্লাহ তাআলার খাদিজা (রা.)-কে একটি পুত্র সন্তান দান করেন যার নাম হেনদ। হেনদের জন্মের কিছুকাল পরেই তার দ্বিতীয় স্বামী আতিক পরলোক গমন করেন। হযরত খাদিজা (রা.)-এর তৃতীয় স্বামী হচ্ছেন তাঁরই চাচাত ভাই সাইফী ইবনে উমাইয়া। তার এ স্বামীর সত্যতা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে সাইফীর সাথে খাদিজার (রা.) আদৌ বিয়ে হয়নি, শুধু বিয়ের কথা হয়েছিল মাত্র। এরপরে তার পিতা মারা যাওয়ায় সে পিতার সংসার নিয়েই ব্য¯ হয়ে উঠেন।

নবীজী (সা.) ও বিবি খাদিজা (রা.) ঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) সাথে বিবি খাদিজা (রা.)-এর প্রথম যোগসূত্র হয় ব্যবসায়িক খাতিরে। পিতা ও স্বামীত্রয়ের অঢেল স¤žত্তি ও ব্যবসা বাণিজ্য হযরত খাদিজা (রা.) একার পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তার জন্য অতীব জরুরী হয়ে পরে একজন ন্যায়পরায়ণও দক্ষ সহচরের। আর সেই সূত্রেই আরবের সবচেয়ে দক্ষ ও বিশ্বস্ত যুবক আল-আমীন নামে খ্যাত মুহাম্মদকে তার ব্যবসায়িক দায়িত্বে নিয়োজিত করা। অবশ্য তিনি আগেই স্বপ্নযোগে জানতে পেরেছিলেন যে, অচিরেই তিনি মুমিনক‚লের জননী হতে যাচ্ছেন অর্থাৎ জগতের সর্বাপেক্ষা মহাপুরুষের পরিণয়ে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন। একদা রাতে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন পূর্ণিমার রাত, আকাশ নির্মল, পূর্ণচন্দ্রের øিগ্ধ কিরণে সমগ্র জগৎ আলোকিত। এমনি এক পরিবেশে আকাশ থেকে পূর্ণচন্দ্র ধীরে ধীরে নেমে এসে তার বুকে আশ্রয় নিল। চন্দ্রের বিমল কিরণে তাঁর সর্বশরীর অপূর্ব আলোকে উদ্ভাসিত হলো। অরকা বিন নওফলের কাছ থেকে এ স্বপ্নের তাবীরের মাধ্যমেই তিনি জানতে পেরেছিলেন এ মহা সুসংবাদের কথা। কিন্তু এ মহাপুরুষ যে, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ একথা তার জানা ছিল না।

পরবর্তীতে রাসূল (সা.)-এর আচার-আচরণ, চলা-ফেরা ও শারিরীক অবকাঠামো দেখে তিনি ঠিকই বুঝতে পেরে ছিলেন যে, মুহাম্মদ (সা.) আখেরী জামানার শেষ পয়গম্বার যাই হোক অবশেষে ৬৯৫ ঈসায়ী সালে বেশ ধুমধামের সাথে তাঁদের বিয়ে স¤žন্ন হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে হযরত খাদিজা (রা.) পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ভাগ্যবতী রমণী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এ গৌরবই ছিল খাদিজার (রা.) সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এবং চাওয়া-পাওয়ার শেষ স্তর অর্থাৎ এর পরে তার জীবনে চাওয়া পাওয়ার কিছুই বাকী ছিল না। তাই খাদিজা (রা.) তার জীবনের সকল উপার্জন ধন-স¤žত্তি রাসূল (সা.)-এর কদমে সমর্পণ করলেন এবং নিজেকে আÍনিয়োগ করলেন এ মহান ব্যক্তিত্বের খিদমতে বা সেবায়। নবী জীবনের অনেক দুঃখ কষ্টের সাথে অংশীদার হয়েছেন খাদিজা (রা.)। কিন্তু শত কোটি দুঃখ কষ্টের মাঝে তিনি কখনো বিচলিত হননি। বিচলিত হওয়াতো দূরের কথা বরং তিনি রাসূল (সা.)-কে বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে সাহস যুগিয়েছেন তার প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাবার্তা দ্বারা। নবুওয়াতী পাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে যখন রাসূল (সা.) নানা প্রকারের অলৌকিক কর্মকান্ডে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পরতেন তখন তিনি তাঁর বিভিন্ন প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও সেবা দ্বারা নবী (সা.)-এর অন্তরে সাহস যোগাতেন। তিনি ছিলেন নবীর (সা.)-এর দুঃখের দিনের সাথী। আরবের মরুপ্রান্তরে ইসলাম প্রচারের কারণে যখন রাসূল (সা.)-কে নির্বাসনে দেয়া হয়েছিল তখনও তিনি নবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন। নবীজীর ঔরশে মহান আল্লাহ তাআলা খাদিজা (রা.)-কে দু’জন পুত্র সন্তান এবং চার জন কন্যা সন্তান দান করেন। দু’পুত্র সন্তান হচ্ছেন- হযরত কাসেম ও হযরত আবদুল্লাহ। ঐতিহাসিকদের মতে, হুযূর (সা.)-এর দু’সন্তানই শৈশবে মৃত্যুবরণ করেন। কারো কারো মতে, জন্মের পরপরই এ সন্তানদ্বয় মৃত্যুকোলে পতিত হয়। আর চার কন্যা সন্তান হচ্ছেন ১. হযরত জয়নব (রা.), ২. হযরত রোকাইয়া (রা.), ৩. হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) ও ৪. হযরত ফাতিমা (রা.)।

হযরত খাদিজা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ঃ ইসলামের বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিবর্গের সাথে খাদিজা (রা.)-এর সম্পর্কই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বহন করে। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন- দু’জাহানের সরদার হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিনী তেমনিভাবে তিনি ছিলেন খাতুনে জান্নান ফাতিমা (রা.)-এর জননী। সেই সূত্রে হযরত খাদিজা (রা.) জান্নাতের যুবকদের সরদার হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইনের (রা.) নানী হওয়ার গৌরবও অর্জন করেন। এ ছাড়াও রাসূলে করীম (সা.) নিজ মুখে খাদিজা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে গেছেন হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূল (সা.)-এর মুখে বারবার হযরত খাদিজার (রা.) প্রশংসা শুনে একবার বিরক্ত হয়ে নবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কি খাদিজার (রা.) মত আর কোন নারী দেখেন না? আপনার মুখে সবসময়েইত তার প্রশংসার কথা শুনি। উত্তরে নবীজী (সা.) বললেন না, খাদিজার মত আমি আর কোন নারীকে দেখি না। দুনিয়ার কোন নারীর পথে তার তুলনা হয় না।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা (রা.) অপর এবং হাদীসে বর্ণনা করেন, একদা আমি রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি খাদিজার মত এক বৃদ্ধার কথা কেন ভুলতে পারেন না? খাদিজা অপেক্ষা ভাল স্ত্রী আল্লাহ তা‘আলা এখন আপনাকে দান করেছেন। আমার একথায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এত রাগ করলেন যে, তার মুখ মন্ডলের দিকে আমি তাকাতে সাহস করলাম না। আমি তখন ভীত হয়ে মনে মনে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলাম- হে আল্লাহ আমার প্রতি হযরতের রাগ কমিয়ে দাও। জীবনে আর কখনো হযরত খাদিজার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করব না। আমার অনুতপ্তের অবস্থা বুঝতে পেরে অবশেষে রাসূল (সা.) অপেক্ষা কৃত শান্ত সুরে আমাকে বললেন হে আয়িশা! খাজিদা সম্বন্ধে এরূপ কথা তুমি কিভাবে বলতে পারলে? যখন দুনিয়ার প্রত্যেকটি লোক আমার শত্রæ ছিল, তখন একমাত্র খাদিজাই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেছিল। হে আয়িশা! সেই সত্ত¡ার কছম যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ তাআলা এখন পর্যন্ত খাদিজা অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী আমাকে দান করেননি।

বেহেশতের পথে পাড়ি ঃ রাসূল (সা.)-এর সাথে তিন বছর নির্বাসিত জীবন-যাপন করার পর খাদিজা (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে ৬৫ বছর বয়সে রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতের দশম বছরে রমদ্বান মাসের ১০ তারিখ হযরত খাদিজা (রা.) বেহেশতের পথে পাড়ি জমালেন।

মৃতুকালে হযরত খাদীজা (রা.) রাসূল (সা.)-এর নিকট একটি আরজি পেশ করলেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) যে পাগড়ি পড়া অবস্থায় আপনার উপর প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল, আমার কাফনের কাপড়ের জন্য সে পাগড়ী ব্যবহার করবেন, আমার মনে হয় তাতে আমি কবর আজাব থেকে মুক্তি পাব।

খাদিজা (রা.)-এর ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তাকে গোসল করালেন এবং উক্ত পাগড়ি দ্বারা কাফন পড়ালেন। সে সময়ে জানাযার নামাজের হুকুম ছিল না, তাই খাদিজা (রা.)-কে কোন জানাযা না পড়িয়েই হেরেম শরীফের অদরে জান্নাতুল মোয়াল্লা নামক গোর¯ানে সমাধিস্থ করা হয়। দাফন শেষে রাসূল (সা.) কবরের উপর উপুর হয়ে পড়ে থেকে খাদিজার (রা.)-জন্য দু‘আ করেন।

শেয়ার করুন:
  • জনপ্রিয়
  • সাম্প্রতিক

নির্বাচিত

Don`t copy text!