সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা.)

-অধ্যাপক ড. এম. শমশের আলী

সমসাময়িক বিশ্ব-ঘটনাবলীর দিকে যেই তাকাবে সেই লক্ষ্য করবে যে, পেশী-শক্তির উপরে যুক্তির প্রাধান্য বিরাজ করছে না, আমাদের মূল্যবোধ ইতোমধ্যেই ক্ষয় পেতে শুরু করেছে, আর আমাদের এমন কোন নেতা নেই যার  উপর আমরা ভরসা করতে পারি। আমরা একটি সংকটের মধ্যে আছি। বর্তমান পরিস্থিতি একজন লোকের কথা মনে করিয়ে দেয় যিনি এই গানটি লিখেছিলেন, “Where have all the flowers gone, long long time ago?” এই লোকটি যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে উনি আরো একটি গান গাইতেন, “Where have all the values and valor gone?” ইতিহাসে এর আগে কখনো একজন আদর্শ নেতার সংকট এত প্রকটভাবে  দেখা দেয়নি। যেমনটি আজ দেখা দিয়েছে। এ যুগের চাহিদা একজন নেতা যিনি সমগ্র মানব স¤প্রদায়ের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হতে পারেন। যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এ ধরনের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করা এবং তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এইসব ব্যক্তিত্বের জীবন ও শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করা। মানবজাতি সব সময় এমনি অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের সন্ধানে  রয়েছে এবং বিভিন্ন সমাজ এ উদ্দেশ্যে তাদের চিহ্নিত করেছে। এখন প্রশ্ন হলো- এই ব্যক্তিগণ কি সত্যিই সময়ের বিচারে উত্তীর্ণ হয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে ঐসব ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করা যায় যাদেরকে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে- যেমন, জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন,  মাও সে তুং, মহাত্মা গান্ধী এবং তাদের মত অন্যান্যরা। তাদের চরিত্রের বিস্ময়কর গুণাবলীর জন্য মানুষ তাদের স্মরণ করে, কিন্তু যদি কেউ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, গতিশীল নেতৃত্ব, চরিত্রের সাহসিকতা, সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা এবং স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা প্রভৃতি দিকগুলো বিবেচনা করে তাহলে বলা যাবে না যে, এসব মহৎ লোকগণ  যুগের সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁরা কেবলমাত্র একটি বিশেষ সময়ের জন্য বিশেষ কোন ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ স্যার উইনস্টন চার্চিলের কথা বলা যায়। মানুষ আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে কী করে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ দ্বীপসমূহের মানুষকে একতাবদ্ধ করেছিলেন এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা করে রেখেছিলেন। এরপরও, যখন একই ব্যক্তি চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই নির্বাচনে প্রার্থী হলেন, তিনি তাতে হেরে গেলেন! জনগণ ব্যাপারটি এভাবে বিচার করলো: চার্চিল হলেন যুদ্ধকালীন নেতা, শান্তিকালীন নেতা নয়। এভাবে, ব্রিটিশদের কাছে চার্চিল একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন একটা বিশেষ সময়ের জন্য, সব সময়ের জন্য নয়। এবার ধরা যাক মাও সে তুং এর কথা।  কে না জানে তিনি চীনের মূল ভূ-খÐে কত বড় সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন? কিন্তু ইতিহাসের কি পরিহাস! মাও সে তুং এর মৃত্যুর পর  “দ্যা গ্যাং অব ফোর”, যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে জননন্দিত হয়েছিল, তাদেরকে গা ঢাকা দিতে হয়েছিল। এমন কি মাও সে তুং এর স্ত্রীর জীবনেও নেমে এসেছিল বিপর্যয় । আবারও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পূর্বের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বদের নেতৃত্ব পরবর্তী সময়ে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করা হলো না।

বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে বিশেষ অবদানের জন্য নেলসন মেন্ডেলাকে একজন অবিস্মরণীয় নেতা মনে করা হয়। কিন্তু তার জীবনের কিছু দিক, যা একান্তই তার ব্যক্তিগত, তার সময়ের অনেক লোকের পছন্দ নয়। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে এমন কোন নেতা পাওয়া মুশকিল যিনি সর্বযুগে সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। যুগে যুগে অনেক ধার্মিক ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন দেশে এসেছেন। তাদের চরিত্র ছিল বিতর্কের ঊর্ধ্বে, তাদের সততা ছিল দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করেননি। মানুষ চায় এমন আদর্শ ব্যক্তিত্ব, যিনি সত্য কথা বলেন, যিনি হিংসা-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে, যিনি মানুষকে বর্ণ, ধর্ম ও বিশ্বাস নির্বিশেষে ভালোবাসেন এবং যিনি মানুষকে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সকল কাজে নেতৃত্ব দিতে পারেন।

এ ধরণের আদর্শ ব্যক্তিত্ব কি পৃথিবীতে এসেছিলেন? হ্যাঁ, এসেছিলেন। এবং তাঁর নাম হযরত মুহাম্মদ (সা.)।

পবিত্র কুরআনের ২১নং সূরার ১২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাঁকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য পাঠানো হয়েছে, কোন বিশেষ মানবগোত্রের জন্য নয়। তাঁর নিকট যে মহাগ্রন্থ অবতীর্ণ করা হয়েছে তাও সার্বজনীন এবং সমগ্র মানব স¤প্রদায়ের জন্য। পবিত্র কুরআনে ৩৩ নং সূরায় ২১নং আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ও আখেরাতের  উপর যার বিশ্বাস রয়েছে এবং যে আল্লাহর প্রশংসায় মশগুল থাকে, সে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে জীবন পরিচালনার একটি সুন্দর আদর্শ খুঁজে পাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) কে যে সমগ্র মানবজাতির  অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে, তা তাঁর সমস্ত কথায় ও কাজে সুস্পষ্ট এবং এ কথা ও কাজগুলোকে যদি ছাত্রদের সম্মুখে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তা তাদের চরিত্র গঠনে বিশেষ অবদান রাখবে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একাধারে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ স্বামী, একজন আদর্শ যোদ্ধা, একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক এবং একজন আদর্শ ধর্মপ্রচারক। তাঁর জীবন ও চরিত্র ইতিহাসে এত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে যে, তাঁর কথা ও কাজের বিবরণ সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

পবিত্র কুরআনের আদর্শের তিনি ছিলেন জীবন্ত নিদর্শন এবং তাঁকে অনুসরণ করে যে কেউ সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়ে মানবতার সেবা করতে পারে। নবীজীর একটি বড় আদর্শ, যা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল ছাত্রদের জানানো উচিত, তা হলো অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে তার ব্যবহার। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে যে, ইসলামই একমাত্র জীবন বিধান (দ্বীন), তথাপি মুসলমানদের বলা হয়েছে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে খারাপ ভাষা ব্যবহার না করতে যাতে তারা আল্লাহর সম্পর্কে কু-মন্তব্য করার অবকাশ না পায়। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি  মুসলমানদের আচরণবিধি কী হবে, তা হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নিজের জীবনে দেখিয়ে গেছেন। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর যে রাষ্ট্র তিনি গঠন করেছিলেন তার ভিত্তি কি ছিল? এটাই ঐতিহাসিক ‘মদীনা সনদ’, পৃথিবীর সর্বপ্রথম গঠনতন্ত্র। এই গঠনতন্ত্রের একটি ধারা ছিল যে বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে এবং কেউ অন্যের ধর্ম পালনের বিষয়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।  এটা শুধুই একটা ‘ধারা’ ছিল না, এই ধারাটি বাস্তবায়িত করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে এত সুস্পষ্ট উদাহরণের পরেও কোন মুসলমানকে সা¤প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কি? এছাড়াও পবিত্র কুরআনে বার বার জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, মানব স¤প্রদায় এক ও অভিন্ন জাতি। তাই যদি কোন মুসলমানকে সা¤প্রদায়িক বলা হয় তাহলে তার এটা গ্রহণ করা উচিত এবং বলা উচিত যে তার স¤প্রদায় সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত। ধ্যান ধারণা ও কাজে গোষ্ঠী-মানসিকতার প্রতিফলন ঘটানো কোন মুসলমানের পক্ষে অসম্ভব। বস্তুতঃ যে-কেউ পবিত্র কুরআন পাঠ করেছেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী পাঠ করেছেন তিনি অনতিবিলম্বে এই উপসংহারে পৌঁছাবেন যে  ইসলাম ও সা¤প্রদায়িকতা পাশাপাশি থাকতে পারে না। একমাত্র সেই সমাজেই সা¤প্রদায়িকতা বিরাজ করতে পারে যেখানে ইসলাম পালিত হয় না, যেখানে সামাজিক ন্যায় বিচার নেই, যেখানে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা নেই। “সা¤প্রদায়িক” শব্দটির বর্তমান সময়ের অর্থে একজন মুসলমান কি করে সা¤প্রদায়িক হতে পারে যখন সমগ্র মানবজাতিকেই ইসলামে এক জাতি আখ্যায়িত করা হয়েছে?

 

এ কথাটি সবাইকে বুঝাতে হবে যে, বর্তমান সময়ে যদি কেউ একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক, একজন আদর্শ ধর্ম প্রচারক, একজন আদর্শ সমাজ সংস্কারক এবং একজন মানবতাবাদীকে খুঁজতে চায় তাহলে তার অনুসন্ধান তাকে নিয়ে যাবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট। তিনি বুঝতে পারবেন যে সমস্ত মানুষের জন্য এবং মানুষের সমস্ত কর্মের জন্য নবীজী মানব জাতির আদর্শ এবং সর্বকালের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। এরূপ চিহ্নিতকরণ শুধু মুসলমানই করবে না বরং যেকোন ধর্মের যেকোন বিবেকবান লোকই এটা করবে।

জর্জ বার্নার্ড শ্য থেকে একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি :

“আমি সব সময় মুহাম্মদের ধর্মকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছি এর আশ্চর্য জীবনী শক্তির জন্য। এটিই একমাত্র ধর্ম, যার পরিবর্তনশীল দুনিয়ার সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা আছে বলে আমার মনে হয়। আর এ ধর্ম সর্ব যুগেই সমাদৃত হতে পারে। আমি এ বিস্ময়কর লোকটিকে বুঝতে চেষ্টা করেছি এবং আমার মতে তিনি এ্যান্টি-ক্রাইস্টতো নয়ই বরং তাকে মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলা উচিত। আমার বিশ্বাস তার মতো একজন মানুষ যদি বর্তমান বিশ্বের একনায়ক হতেন তা হলে তিনি এ সমস্যাগুলোর এমন সমাধান দিতে সক্ষম হতেন যা পৃথিবীতে শান্তি ও সুখ এনে দিত। মুহাম্মদের ধর্মের ব্যাপারে আমি এরূপ ভবিষ্যৎবাণী করেছি যে, এটি যেমন বর্তমান ইউরোপে গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে তেমনি আগামী দিনের ইউরোপেও তা গ্রহণযোগ্য হবে ।” (জর্জ বার্নার্ড শ্য,  দি জেনুইন ইসলাম, সিঙ্গাপুর, ভলিউম ১, ১৯৩৬)

এখন যখন মানব স¤প্রদায় নানা যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়ছে এবং ‘শক্তিশালী’ ও ‘উগ্র’ এই দুই শক্তির দ্ব›েদ্ব ছিন্নভিন্ন এবং নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠরা চরম ভয়ভীতি ও অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে, তখন এমন লোকের আবির্ভাব, যিনি মানবজাতির ত্রাণকর্তার অনুসারী, সবার কাছেই একটি স্বাগত সংবাদ হবে। সেই ব্যক্তিটি গণতন্ত্রী কি একনায়ক তাতে কিছু আসে যায় না, যতক্ষণ তিনি মানবতার দিকে দৃষ্টি রাখেন এবং আর সব কিছু ভুলে যান। মানবজাতীর অনুকরণীয় আদর্শ নবীজী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শুভ জন্মদিনে মহান আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা হোক মানবজাতির পরিত্রাণ।

 

[লেখক: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউক্লিয়ার ফিযিসিস্ট;

সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী;

প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি]

শেয়ার করুন:
  • জনপ্রিয়
  • সাম্প্রতিক

নির্বাচিত

Don`t copy text!